নোয়াখালী প্রতিনিধি।
নোয়াখালীতে গত ৯ জুলাই থেকে তারা ৪ দিনের টানা অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সৃষ্ট বন্যায় জেলার ছয় উপজেলার হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছিল । এখনও ১৬ হাজার ৯৩০ পরিবার পানিবন্দি রয়েছেন। বিভিন্ন খাতে সব মিলিয়ে বন্যা ও জলাবদ্ধতায় নোয়াখালীতে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪০ কোটি ১২ লাখ টাকা।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৮ জুলাই থেকে শুরু হওয়া অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলার ৬টি উপজেলার ৫৭টি ইউনিয়ন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় । এতে ২ লাখ ৩ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়। এ ছাড়া সেনবাগ, কবিরহাট ও সুবর্ণচর উপজেলায় আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫৭টি বসতঘর এবং সুবর্ণচরে একটি ঘর সম্পূর্ণভাবে ধসে পড়েছে। আজ শনিবার বিকেল পর্যন্ত ৪১ হাজার ৯৫৩ জন মানুষ পানিবন্দি থাকার তথ্য দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়।
যদিও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। এখন শহর ও উঁচু অঞ্চলের পানি নেমে গেলে ও অধিকাংশ গ্রাম-গঞ্জের নিম্নাঞ্চলের জনগোষ্ঠী পানিবন্দি দশার দুর্ভোগ পোয়াচ্ছে।
জানা গেছে, গত বছরের মত এবারও বন্যায় সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে মৎস্য খাতে।পুকুর-খামার ভেসে যাওয়ায় বড় মাছের ক্ষতি হয়েছে ১১২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। পোনা মাছের ক্ষতি হয়েছে ২২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। কৃষি খাতেও লেগেছে বড় ধাক্কা। ৫ হাজার ৫০৭ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ এবং ২ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমির ফসল আংশিকভাবে নষ্ট হয়েছে। আমন ধানের বীজতলার ক্ষতি হয়েছে ৮৯১ হেক্টর জমিতে। সব মিলিয়ে কৃষিতে ক্ষতির পরিমাণ ৫১ কোটি ১৮ লাখ টাকা।
আরও জানা যায়, কবিরহাট, সেনবাগ ও সুবর্ণচরে ৫৮টি বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ক্ষতির পরিমাণ ১০ কোটি লাখ ৫০ হাজার টাকা । হাঁস-মুরগি মারা গিয়ে প্রাণিসম্পদ খাতে ক্ষতি হয়েছে ৫৬ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। ৬০০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৩০ কোটি টাকা। বাঁধ ও নদীতীর রক্ষা ব্যবস্থায় ক্ষতি হয়েছে ২৩ কোটি টাকা। সরেজমিন বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা যায়, কোম্পানীগঞ্জ, কবিরহাট, সদর, সেনবাগ, সুবর্ণচর ও হাতিয়া উপজেলার নিম্নাঞ্চল এখনো পানির নিচে। সবচেয়ে বেশি জলাবদ্ধতা রয়েছে কবিরহাট, সদর, কোম্পানীগঞ্জ ও সেনবাগে।
সুবর্ণচর উপজেলার কৃষক আনোয়ার মিয়া বলেন, চারপাশ পানিতে তলিয়ে থাকায় বীজতলা তৈরির জায়গা পাচ্ছেন না। কেউ কেউ উঁচু জায়গা ভাড়া নিয়ে বীজতলা করছেন, কিন্তু পুঁজি সংকটে তিনি তা পারছেন না। পানিতে সবজি ক্ষেতও নষ্ট হয়েছে। ধার-দেনা পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় তিনি। সরকারের সহায়তা ছাড়া ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।
সদর উপজেলার ৫ নং বিনোদপুর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য জহুরুল হক পাখি বলেন, আমার ওয়ার্ডের ৫৫ শতাংশ বাড়িতে এখনো পানি। নোয়াখালী খালের পানি নামার গতি ধীর হওয়ায় দুর্ভোগ লম্বা হতে পারে।
সদর উপজেলার ২০ নং আন্ডারচর ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল মান্নান বলেন, গত বছর এই নোয়াখালীবাসী স্মরণকালের জলাবদ্ধতার মোকাবিলা করেছে। সেই জলাবদ্ধ থেকে তো আমাদের প্রশাসন কোন শিক্ষা গ্রহণ করেনি যদি শিক্ষা নিত তাহলে বর্ষার পূর্বেই পানি নিষ্কাশনের সকল খালগুলো পরিষ্কার করে এবং প্রভাবশালীদের অবৈধ স্থাপনা গুলো ভেঙ্গে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা তৈরি করে রাখত। কিন্তু প্রশাসন সেদিকে কোন নজরে দেননি। যার কারণে এই বছর জলাবদ্ধতার শিকার হচ্ছি আমরা নোয়াখালীবাসী।
তিনি আরো বলেন আমরা আপনাদের মাধ্যমে প্রশাসন কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি আপনারা স্থায়ীজলাবদ্ধতা নিরশনে পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। শুধু খালের কচুরিপানা পরিষ্কার করে আর বর্ষা মৌসুমে দুই একটি অভিযান পরিচালনা করলেই এ জেলার স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিদর্শন হবে না।
সাংবাদিক হোসন উদ্দিন বলেন, এই জলাবদ্ধতার জন্য আমি অসচেতনতাকে দায়ী করব। কারণ আগে গ্রামে -গঞ্জে পানি নিষ্কাশনের জন্য ছোট ছোট বহু পোল কালবার্ট ছিল। যে কালভার্ট গুলো দিয়ে সহজে বৃষ্টির পানি খাল দিয়ে নদীতে চলে যেতে পারত। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে এখন গ্রাম - গঞ্জের অপরিকল্পিত বাড়িঘর নির্মাণের কারণে সেই পোল কালভার্টগুলো বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে।এতে কেউ কোনো নিয়ম নীতির তোয়াক্কা করছে না। গ্রামগঞ্জে বাড়িঘর নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রতিটি নাগরিকে সরকার কর্তৃক অনুমতি সাপেক্ষে বাড়িঘর নির্মাণের আওতায় আনতে হবে। গ্রামগঞ্জের বাড়ি ঘর নির্মাণের ক্ষেত্রে কোন অবস্থায় যেন পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ না করা হয় সেই বিষয়ে প্রশাসনকে নজরদারি করতে হবে।পানি নিষ্কাশনের পথ সহজ হলে জেলা বাসিকে আর জলাবদ্ধতার এই দুর্ভোগে পড়তে হবে না।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান বলেন, অতিবৃষ্টিতে জেলার ৯ উপজেলাতেই খেতের ফসল,আমন বীজতলা, পুকুর ও খামারের মাছ, পোলট্রি খামার, হাঁস-মুরগি, রাস্তা ও বেড়িবাঁধের ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন খাতে সব মিলিয়ে বন্যা ও জলাবদ্ধতায় নোয়াখালীতে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪০ কোটি ১২ লাখ টাকা। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করে ক্ষয়ক্ষতির এই তথ্য নেয়া হয়েছে। জেলা আবহাওয়া কর্মকর্তা মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বলেন, নোয়াখালীতে জুলাই মাসে গড় বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা ৬৯০ মিলিমিটার।