ছায়েদ আহামেদ, হাতিয়া (নোয়াখালী)
নামে-বেনামে শতশত একর জায়গা দখলে-বেদখলে পরে আছে। তবুও সরকারি বনের গাছ কেটে ফাঁকে ফাঁকে নির্মান হচ্ছে বাড়ি-ঘর। আরেকপ্রান্তে জেটি নির্মান করে তৎসংলগ্ন থেকে শুরু করে বনের সারি সারি গাছ কেটে করা হয় দীর্ঘ সড়ক ও দোকানপাট । এমন বিশৃঙ্খল, বেপরোয়া ও আধিপত্যের বেষ্টনীতে অরক্ষিত নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার ঢালচরের বনায়ন। যেখানে সম্পূর্ণ নির্বিকার উপজেলার নলচিরা বনবিভাগ। মাসের পর মাস গুজারি গেলেও বন সংশ্লিষ্ট কারো দেখা মেলেনা এই দূর্গম এরিয়ায়। বনবিভাগের এই উদাসীনতার ফলে ইতোপূর্বে উজাড় হয়ে গেছে চরটির পূর্ব-উত্তর পাশের চর গাসিয়ার বনায়নও।

গত সোমবার ট্রলারযোগে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঢালচরের পূর্ব-দক্ষিন কোণে নির্মিত জেটি থেকে শুরু করে ম্যানগ্রোভ বনের সারি সারি গাছ কেটে মাঝ দিয়ে উত্তর দিকে করা হয় সড়ক। যুক্ত করে পশ্চিম দিকে করা হয় আরেকটি সড়ক। এর মাথায় নির্মিত হচ্ছে দোকানপাট ও ব্যবসা কেন্দ্র। গড়ে তোলা হয় মাছ ঘাটও। অবস্থানরত ব্যবসায়ীদের জিজ্ঞেস করলে তারা পার্শ্ববর্তী মনপুরা থেকে এসেছে বলে জানায়। স্থানীয় ও সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, মনপুরার একটি প্রভাবশালী পরিবার( সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সচিব নাজিম উদ্দিন চৌধুরী ও তার দখলসঙ্গী চাচা মনপুরা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন চৌধুরী)বনবিভাগের বাধা উপেক্ষা করে নিজেদের প্রয়োজনে অব্যাহত ভাবে এসব অনিয়ম করে যাচ্ছে। স্বাধীনতা পূর্ব ও উত্তর সময় থেকে তারা একেকবার একেক শক্তি এবং গোষ্ঠীর সাথে সম্পর্ক গড়ে হাতিয়াবাসীর এ চরের দক্ষিণ পাশের প্রায় চার বর্গকিলোমিটারের মতো দখলে রেখেছে। ইতোপূর্বে এদের দখলদারত্বের বিরুদ্ধে অনলাইন ও বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
ওই অংশে বন কাটার সাথে প্রভাবশালী পরিবারের অনুগত বেলাল মেম্বার টিম জড়িত বলে জানা যায়। মুঠোফোনে বেলাল মেম্বারের সাথে কথা হলে তিনি জানান, এসব নাজিম উদ্দিন চৌধুরীর পরিবারের সিদ্ধান্তক্রমে হয়েছে। এতে তার কোনো দায় নেই বলে জানান।
এদিক শেষে ট্রলারযোগে আবার যাত্রা শুরু 'চর কলাতলি'র দিকে। সেখান থেকে হাতিয়ার ঢালচরের রাস্তার মাথায় পা রাখতেই হাঁটু সমান পানি আর কাদামাটি। দীর্ঘপথ কাদামাটি পাড়ি দিয়ে মাদ্রাসা বাজার হয়ে আসা হয় মসজিদ মার্কেট। এখানে কিছু মানুষের সাথে কথা হয়। জানা যায়, পাশের ম্যানগ্রোভ বন কেটে গৃহ নির্মানসহ জমি পরিস্কার করা হচ্ছে। দেরি না করে সাইক্লোন সেন্টার থেকে দক্ষিণের কাঁচা রাস্তায় শুরু হয় পথ চলা। যা(রাস্তাটি) ঢালচরের পুরাতন মসজিদের কাছে গিয়ে শেষ হয়। কাঁচা রাস্তায় কাদামাটি কোথাও হাঁটু সমান, কোথাও বা একটু কম। পাশে তাকাতেই দেখা মিলে বনের ভিতর ছোট-ছোট অসংখ্য বাড়িঘর, নতুন পুরাতন কেটে ফেলা গাছের অসংখ্য গোড়া। মসজিদ সংলগ্ন থেকে উত্তর দিকে ম্যানগ্রোভ বন কেটে এক-দেড় একর করে প্রস্তুত হচ্ছে চাষাবাদের জমি। চরে বসবাসরত অনেকে আবার বনের গাছ এবং লাকড়ি নিয়ে তাদের প্রয়োজন মেটায়। এর জন্য বছর শেষে বনরক্ষকদের নিয়োজিত ব্যক্তিকে দিতে হয় ৫০০ থেকে এক হাজার করে টাকা কিংবা ২০ থেকে ৪০ কেজি করে ধান। বনের উপর এমন আক্রমণ সম্পর্কে কয়েকজন বাসিন্দা ও এক বাথানিয়া নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, হাতিয়া এবং বহিরাগত কিছু ভূমি খেকো একেকবার একেক সময় দ্বীপ হাতিয়ার বিভিন্ন এলাকার নদী ভাঙা মানুষজন থেকে ৩০-৫০ হাজার করে টাকা নিয়ে বনের ভেতর জায়গা করে দেন। উপজেলার সুখচর ইউনিয়নের ০১নং ওয়ার্ড ঢালচরের এ বাসিন্দারা আরো জানান, গত দুই মাসের মধ্যে বন এলাকায় ফরেস্টের কোনো লোকজনকে তারা দেখতে পাননি।

হাতিয়া উপজেলার নলচিরা রেঞ্জের ঢালচর বিট কর্মকর্তা আরিফুর ইসলামের দেওয়া তথ্য অনুয়ায়ী ২০২৪-২৫ এ ঢালচরে ৪টি বন মামলা হয়েছে। বনবিভাগের তথ্যে আরো জানা যায়, মনপুরা এলাকার বেলাল মেম্বার গং'দের আসামি করে ইতোপূর্বে একটি মামলা হয়েছে( ৬/ঢাল/২০২৪-২৫)।
এছাড়া, ঢালচর এলাকার কাইছার উদ্দিন এবং ওছমানকে আসামি করে বন মামলা (পিওআর নং ০৪/ডিসিঅব ২০২৩-২৪) করা হয়েছিল।
নলচিরা বন কর্মকর্তা আল-আমিন গাজী জানান, সরকারি বেতন-ভাতা ভোগ করার পরও চাঁদা কালেকশন, অনিয়ম বা দায়িত্বে অবহেলা করার সুযোগ নেই।
নোয়াখালী ও হাতিয়া আইনজীবী সমিতির সদস্য সিনিয়র এডভোকেট মো. নুরুল ইসলাম বলেন, 'ঢালচর হাতিয়ার বহু পুরোনো চর। এ চরাঞ্চলের বনভূমিও একসময় খুব দেখার মতো ছিল, যেখানে বন্যপ্রাণিও ছিল প্রচুর। কিন্তু বনের উপর অবিরাম অবিচারের কারণে তা আজ হুমকির মুখে। যা আমাদের পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এ বনাঞ্চল রক্ষার ক্ষেত্রে বনবিভাগের সুদৃষ্টি ও আশু পদক্ষেপ কামনার পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদেরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। '
নোয়াখালী উপকূলীয় বন কর্মকর্তা আবু ইউসুফ জানান, খোঁজখবর নিয়ে বিষয়টি দেখতেছি। যেহেতু এ অঞ্চলের ঢালচরটি একটা সেনসিটিভ জায়গা।