ছায়েদ আহামেদ, হাতিয়া (নোয়াখালী)
নোয়াখালীর হাতিয়ার চরকিং-সুখচর এলাকায় মেঘনার বুকে জেগে উঠা 'চর জোনাক(জাগলারচর)' যেন অলিখিত টাকার খনি। যার কারণে একের পর এক গ্রুপ চর দখলে মরিয়া হয়ে উঠছে। এদের কাছে রয়েছে বহু অবৈধ অস্ত্র। সময়ে সময়ে চলে এ অবৈধ অস্ত্রের মহড়া। গত ১৯জুলাই সকালে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে এক পক্ষের অন্তত পাঁচ জন গুরুতর জখম হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করছে। চর 'টির উত্তর পাশসহ প্রায় জমিতে ধানবীজ গজিয়ে উঠলেও দক্ষিণাংশে এখনো চলছে ৪টি ট্রাক্টর দিয়ে অবিরাম জমি কর্ষণ। এমতাবস্থায় বনের জায়গা পুনরুদ্ধার এবং পরিস্থিতির স্বাভাবিকতা আনায়নে ফরেস্ট এবং স্থানীয়রা প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
গত বুধবার সরেজমিনে গিয়ে কয়েকজন চাষীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, সুখচর এলাকার কাইন্না খাল সোজা পশ্চিমে চর'টির উত্তরাংশে রয়েছেন টেডাইঙ্গারা। যাদের নেতৃত্বে রয়েছে নিজাম মেম্বার ও নবীর উদ্দিন এবং এদের কর্মকান্ড বাস্তবায়নে রয়েছে ফিরোজ উদ্দিন নামের একজন। আর দক্ষিণাংশে প্রায় তিন হাজার একর বনের জায়গা দখলে রেখে রমরমা বানিজ্য করে যাচ্ছেন, নাসির-মেহরাজ-ছালা উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন একটি গ্রুপ। এ অংশে দাগ(৯৬-১০০ শতক) প্রতি পাঁচ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়ে ভূমিহীনসহ সাধারণ মানুষদেরকে চাষের জন্যে বুঝিয়ে দিচ্ছেন এ চক্রটি। তারা এ পর্যন্ত প্রায় ৫শ জন থেকে টাকা নিয়েছে বলে জানান কৃষকরা। যা পুরোপুরি অজানাই রয়েছে বলে জানান উপজেলা ভূমি অফিস।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুইজন কৃষক জানান, চরের দক্ষিণ পাশে জায়গা বুঝিয়ে দিতে ভূমিহীন ও সাধারণদের থেকে সরাসরি টাকা নিচ্ছেন চরকিং ইউনিয়নের শুল্লকিয়া ও ইসলাম মার্কেট এলাকার- নাসির(সুখচরের বাসিন্দা- দক্ষিণে আশ্রিত), ছালা উদ্দিন, রাসেল ও বাবুল হক। এদের পেছনে রয়েছে এখানকার সাবেক এক মেম্বার। যিনি সবসময় স্রোতের অনুকূলের রাজনৈতিক নেতাদের আনুকুল্যে থেকে অপরাধপ্রবণতা চালিয়ে যান।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দক্ষিণে এই গ্যাংয়ের সংযোগস্থল উক্ত এলাকার চর সংলগ্ন কিল্লা বাজার। এবং দুই সাইডের মধ্যবর্তী কাইন্না খাল সোজা পশ্চিমে- ভাটার সময় মেঘনার এ অংশ শুকিয়ে গেলে দুই ইউনিয়নের লাগোয়া চর'টিতে সংযোগস্থল হিসেবে দখলবাজরা সহজে হেঁটে যাওয়া-আসা করতে পরে। এ সুযোগে এরা চরের হরিণ,গরু, মহিষ ও ভেড়া জবাই করে বিভিন্ন স্থানে পাচার করে থাকে। চলতি মাসের ৪ তারিখে এখানে হরিণের মাংস পাচারের একটি ঘটনা ঘটে। উত্তর পাশের চক্রটি জাহিদ নামের এক হোন্ডা চালককে দিয়ে হরিণের মাংস পাচারকালে উপজেলার নলচিরা ঘাট এলাকায় পুলিশের হাতে ধরা পড়ে।
এসব অপরাধ তথা বনের জায়গা দখল ও বন্য প্রাণী অপরাধ বিষয়ে দু'টি মামলা( ঢাল-২/২৫ বন মামলা ও ঢাল-৩/২৫ বন্য প্রাণী মামলা) করেছে বলে জানান নলচিরা বনবিভাগ।
উক্ত বনবিভাগ সূত্র জানায়, চর দখল ও মহিষ চরানো সংক্রান্তে বিভিন্ন গোষ্ঠীর হামলার আশঙ্কা করে চলতি বছরের ১০ জুলাই হাতিয়া থানায় জিডি করা হয়। যা একই তারিখে পত্রাকারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সকলস্তরে অনুলিপি প্রদান করা হয়। অথচ এখন পর্যন্ত সেখানে প্রশাসনের কোনো ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়নি।
এদিকে, ১৯ জুলাই জাগলারচর দখল নিয়ে চরকিং ইউনিয়নের শুল্লকিয়া ও ইসলাম মার্কেট এলাকার- নাসির-ছালা উদ্দিন গ্রুপ সুখচর এলাকার নিজাম মেম্বার-নবীর উদ্দিন গ্রুপের উপর হামলা করে। এতে নিজাম মেম্বারদের জিহাদ,আমজাদ,করিম, রিয়াজ ও মিনহাজ গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়। এ ঘটনায় ২৪ জুলাই হাতিয়া থানায় মামলা হয়। আহত জিহাদ জানান, তারা জমি চাষের জন্য চরে গেছে। কিন্তু দক্ষিণের এরা অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে তাদের উপর অমানুষিক হামলা চালায়। টিশার্ট উঁচিয়ে দেখান- কোমরের হার্ড ভেঙে যাওয়ায় বেল্ট লাগিয়ে কোনো মতে চলেন তিনি।
হামলার প্রত্যক্ষদর্শী রিয়াজ জানান, চরের কিছু অংশে তারা দীর্ঘদিন ভোগদখলে আছেন। কিন্তু দক্ষিণের নাসির-ছালা উদ্দিনেরা পুরো চর দখলে রাখার জন্য তাদের উপর হামলা চালায়।
একরাম,ফরিদা,তাফসির ও ইয়াছিন জানান, তারা ভূমিহীন। চর খালি থাকায় সামান্য কিছু জমি চাষ করতে গেলে দক্ষিণের(চরকিং এলাকা) এরা তাদের উপর দেশীয় ও বিভিন্ন অস্ত্র নিয়ে অবর্ননীয় হামলা চালায়।
চর দখল ও হামলার বিষয়ে দক্ষিণের(চরকিং এলাকা) নাসির-ছালা উদ্দিনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদেরকে পাওয়া যায়নি। তবে উত্তরের(সুখচর) নিজাম গ্রুপ ওরপে নিজাম মেম্বার জানান, তার বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগ মিথ্যা। টেডাইঙ্গা গ্রামের ভূমিহীনরা চরে চাষ করতে যায়, যা তিনি জানেন না বলে উল্লেখ করেন।
চর সংশ্লিষ্ট নলচিরা বন কর্মকর্তা আল-আমিন গাজী বলেন, বনের জায়গায় ট্রাক্টর চালানোর সময় একটিকে বিকল করেছে তারা। এছাড়া বন-বন্য প্রাণি রক্ষা ও চরের জায়গা পুনরুদ্ধারে নির্বাহী কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের অন্যান্য স্তরেও জানানো হয়েছে।
এবিষয়ে হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন জানান, জাগলারচর দখলসহ বিভিন্ন অপরাধ দমনে থানা অফিসার ইনচার্জকে বলে দেওয়া হয়েছে।
সম্পাদক -জুয়েল রানা লিটন, অফিস : নোয়াখালী প্রেসক্লাব, মাইজদী কোর্ট, নোয়াখালী।