নোয়াখালী সদর উপজেলা:
নোয়াখালীর একটি গ্রামীণ বাজারে সাইকেল, মটর সাইকেল থেকেও টোল আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। বাজারটি সদর উপজেলার আন্ডারচর ইউনিয়নে অবস্থিত। স্থানীয়দের কাছে 'বাংলা বাজার' নামে পরিচিত।
বাজার কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত টোল সম্বলিত একটি তালিকা থেকে জানা যায় । সেখানে সাইকেল থেকে ২০ টাকা, মটর সাইকেল থেকে ৩০ টাকা, ওষুধের গাড়ি থেকে ২২০ টাকা এরকম নির্ধারিত হার উল্লেখ রয়েছে।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, ইজারাদার আবু সুফিয়ান উপজেলা প্রশাসনের কাছ থেকে নির্ধারিত অঙ্কে বাজারটির ইজারা নিলেও পরবর্তী সময়ে তা উচ্চলাভে একাধিক অংশে বিক্রি করে দেন। বাজারের নতুন অংশীদাররা এখন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টোল ও চাঁদা আদায় করে সেই অর্থ পুষিয়ে নিচ্ছেন।
ভুক্তভোগী শামীম মৃধা বলেন, “ওইদিন একটা রাদা হাঁস বিক্রি করছিলাম দুই হাজার টাকায়, আর ইজারা নিয়েছে ২০০ টাকা! ভাবুন, কোন জায়গায় আছি! আমি বললাম, আঙ্কেল বিশ টাকা কম নেন, উনি বললেন‘তোমার তো আরো বেশি আসছে।’ বাজারে টাকা খাওয়ার সময় কেমন যেন ভালো লাগে, কিন্তু বাজার নিয়ে একটু কাজ করবে—সেটা না। তিন মাস ধরে কাঁচা বাজারের সামনে ড্রেনের দেয়াল ভেঙে পড়ে আছে, কোনো খবর নেয়নি কেউ।”
জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা তুহিন ইমরান তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “নোয়াখালীর আন্ডারচরের ঐতিহ্যবাহী বাংলা বাজারে সাইকেল, মোটরসাইকেল থেকে শুরু করে প্রতিটি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চাঁদা তোলা হচ্ছে। নারিকেল বিক্রেতার কাছ থেকেও ১০ শতাংশ হারে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। আর এই কাজটি বিএনপি-জামায়াতের একটি প্রভাবশালী মহল পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।”
সাইকেল মটর সাইকেল থেকে চাঁদা আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় মোসলেহ উদ্দিন যিনি শেয়ারদা বলে পরিচয় দিয়েছেন। তিনি জানান, “আমি ২ লাখ ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে এই পরিবহন পার্টটি কিনেছি। এরপর আমি টোল আদায়ের একটি নির্ধারিত হার নির্ধারণ করেছি। সেই হার অনুযায়ী প্রতিদিন বাজারে টোল আদায় হচ্ছে। এক্ষেত্রে যারা সাইকেল, মটর সাইকেলে করে বিভিন্ন মালামাল বিক্রি করে। আমরা তাদের কাছ থেকে মাসিক কিছু টাকা নিই। তবে সাধারণ যানবাহন থেকে নয়।
আইন অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ধারা ৫২(২)-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, “কোনো ব্যক্তি ইউনিয়ন পরিষদ বা উপজেলা প্রশাসনের অনুমতি ব্যতীত ইজারার সম্পূর্ণ বা আংশিক অংশ অন্য কারও নিকট হস্তান্তর বা বিক্রয় করতে পারবেন না।” নোয়াখালী আইনজীবী সমিতির সাবেক সদস্য আব্দুল কবির বলেন, “ইজারার নির্ধারিত টাকার চেয়ে বেশি আদায় করা বা জনগণের ওপর জোরপূর্বক টাকা চাপানো ‘চাঁদাবাজি’ হিসেবে গণ্য হয়। এটি দণ্ডবিধির ৩৮৫ ও ৩৮৬ ধারায় দণ্ডনীয় অপরাধ।”
প্রাপ্ত রসিদ অনুযায়ী, বাজারের টোল হার নির্ধারিত হয়েছে নিম্নরূপ ট্রাক ২২০ টাকা, পিকআপ ৯০ টাকা, টেম্পু ৫০ টাকা, ঔষুধের গাড়ি ২২০ টাকা, সিএনজি ৩০ টাকা, কভার ভ্যান ২২০ টাকা, মধ্যম পিকআপ ১৫০ টাকা, প্রতি ভ্যান ৫০ টাকা, অটোরিকশা ৪০ টাকা, ভ্যান ট্রলি ৫০ টাকা, বেবি ট্যাক্সি ৪০ টাকা, সাইকেল ২০ টাকা এবং মোটরসাইকেল ৩০ টাকা।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ইজারাদার আবু সুফিয়ান স্বীকার করেন যে তিনি বাজারটি পাঁচ ভাগে ভাগ করে অন্যদের কাছে দিয়েছেন এবং তাদের কাছ থেকে অর্থ নিয়েছেন। কথা বলার এক পর্যায়ে আন্ডারচর ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামী সেক্রেটারি শাকিল হোসাইন আবু সুফিয়ানের মোবাইল নিয়ে প্রতিবেদককে জানান, “আমিও এই বাজার ইজারার অংশীদার। যা জানার উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছ থেকে জেনে নিন।”
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, অতিরিক্ত টোল ও চাঁদাবাজির কারণে বাজারে ব্যবসার পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তারা বলেন, “এতো বেশি টাকা দিতে হচ্ছে যে আগের মতো স্থানীয় কৃষিপণ্য আর আসে না। বাজার এখন আগের সেই জাঁকজমক হারিয়েছে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব অনিয়মের ফলে একদিকে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে বাজারের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নোয়াখালী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) একাধিকবার কল ও হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
সম্পাদক -জুয়েল রানা লিটন, অফিস : নোয়াখালী প্রেসক্লাব, মাইজদী কোর্ট, নোয়াখালী।