উৎসে করের অসংগতিতে জমি ক্রয়-বিক্রয়ে নানান সমস্যায় ভুগছে মানুষ

নিউজ ডেস্ক
আপডেটঃ : শনিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৫

 

ছায়েদ আহামেদ, হাতিয়া(নোয়াখালী)

নতুন উৎসে করের অসংগতির ফলে পৌরসভা এলাকায় জমি ক্রয়-বিক্রয়ে নানান ধরনের সমস্যায় ভুগছে মানুষ। এ অবস্থায় মানুষ প্রায় সবাই দান কবলার দিকে ঝুঁকছে। এতে সরকার যেমন বিপুল অঙকের রাজস্ব হারাচ্ছে তেমনি রয়েছে অনিয়মেরও অনেক অভিযোগ।

চলতি বছরের ০১ জুলাই থেকে নতুন উৎসে কর বিধি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এমনসব বাস্তব চিত্র দেখা গেছে নোয়াখালীর হাতিয়া পৌরসভা এলাকায়। একই পরিস্থিতি দেশের অন্যান্য পৌরসভায়ও বিরাজমান বলে খবর পাওয়া গেছে।

২০২৫ সালের ২৪ জুন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক এস.আর.ও. নং ২৬৯-আইন/আয়কর-১৪/২০২৫ গেজেট প্রকাশিত হয়। এতে উৎসে কর বিধিমালা,২০২৪ অধিকতর সংশোধনক্রমে বিধি ৬ এর উপ-বিধি(১)এ উল্লেখিত “সারণী-২ তে বলা হয়- ক্রমিক(১) এ যেকোনো পৌরসভার অন্তর্গত সকল মৌজা দলিলে উল্লেখিত ভূমির মূল্যের ২ পারসেন্ট বা শতকপ্রতি ১০ হাজার টাকা যাহা অধিক।
এখানে ‘বা’ যুক্ত হয়ে ২ পারসেন্ট এর সাথে পূর্বের নিয়মের অসংগতি সৃষ্টি হয়েছে বলে ভুক্তভোগীরা দাবি করেন।

সম্প্রতি স্থানীয় ক্রেতা-বিক্রেতা ও সাবরেজিষ্ট্রি অফিসে কথা বলে জানা গেছে, নতুন বিধিমালা কার্যকর হওয়ার আগে হাতিয়া পৌরসভায় ৪ পারসেন্ট হারে প্রতি লাখে চার হাজার টাকা উৎস কর দিয়ে বিক্রেতা জমি বিক্রি করতো। আর ক্রেতাদের যার থেকে যেমন হারে রেজিষ্ট্রি ফি-নিয়ে দলিল লিখকরা বাকি প্রকৃয়া সম্পন্ন করতেন।
এখন সরাসরি ভূমির উপর মূল্য নির্ধারণ- অর্থাৎ এক শতক ভূমির উৎসে কর ১০ হাজার টাকা। যাহা পৌর এলাকার বিভিন্ন ভূমির মূল্যের চেয়ে বেশি। ফলে অনেকে বায়না চুক্তি বাতিল করেছে, বহু মানুষ দান কবলার দিকে ছুটছেন। আবার অনেকে প্রকৃত মূল্যের চেয়ে দলিলে কম লেখাচ্ছেন।
এছাড়া, ক্রেতাদের থেকে ইচ্ছে মতো রেজিষ্ট্রি ফি ও অন্যান্য খরচ দেখিয়ে অতিরিক্ত ফি নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন একাধিক ক্রেতাসাধারণ।

হাতিয়া পৌরসভা ৮নং ওয়ার্ড শুন্যরচর গ্রামের দিনমজুর গোলাম কিবরিয়ার স্ত্রী জরিনা বেগম জানান, গত মাসে তাদের স্বামী-স্ত্রী দুই জনের নামে শুন্যেরচর মৌজায় ২৬ শতক জমি দান কবলায় গ্রহন করেন। স্থানীয় দলিল লিখক এ দান কবলায় রেজিষ্ট্রি ফি এবং অফিস খরচের কথা বলে ৬২ হাজার টাকা নেন। অথচ রেজিষ্ট্রি ফি হচ্ছে সাড়ে ৭ পারসেন্টসহ অন্যান্য দুই হাজার টাকা। মৌজা মূল্য শতক প্রতি ১২ হাজার পাঁচশ পনর টাকা।
একই ওয়ার্ডের বাবর এবং জহির দুই সহোদর মিলে ১২ শতক জমি দান কবলায় গ্রহন করেন। রেজিষ্ট্রি ফি সহ অন্যান্য খরচের কথা বলে তাদের থেকেও অতিরিক্ত টাকা নিয়েছে বলে জানান তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পৌরসভা ৫নং ওয়ার্ডের এক ব্যক্তি জানান, তিনি পরিষদ এলাকায় বাসা-ভিটি ও নাল জমি মিলে ৫ শতক ভূমি ৪৭ লাখ টাকায় ক্রয় করেছেন। অথচ দলিলে উল্লেখ করেছেন মাত্র ১৩ লাখ টাকা। একই ওয়ার্ডের মন্দির সংলগ্ন উত্তম সাহা জানান, ৭নং ওয়ার্ডস্থ তার ওয়ারিশি সম্পত্তির ৮০ শতক জমি বিক্রির জন্য কয়েকমাস আগে চুক্তি করেন। কিন্তু বর্তমান উৎসে করের অতিরিক্ত চাপে গ্রহীতার সাথে সেই চুক্তি বাতিল করতে বাধ্য হন।

এছাড়া, নতুন বিধির আগে ৭নং ওয়ার্ড এলাকার হাজী আলতাফ হোসেন জনৈক কামাল গংদের সাথে কিছু জমি বিক্রয়ে চুক্তিবদ্ধ হন। এখন নতুন নিয়মের কারণে তাদের মধ্যে দলিল রেজিষ্ট্রির বিষয়ে মতানৈক্য দেখা দেয়।

দলিল লিখক শামীম বলেন, বর্তমান উৎসে কর বিধির কারণে পৌরসভা এলাকায় দলিল রেজিষ্ট্রিতে সমস্যা দেখা দিয়েছে। তাদের কাজকর্ম ও পেশাদারিত্বেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় স্কুল শিক্ষক আলী আশরাফ শাহীন বলেন, পৌর শহর ছাড়া আশপাশের অধিকাংশ জমি পতিত অবস্থায় রয়েছে। জমির মূল্যের তুলনায় উৎসে কর বেশি হওয়ায় সাধারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জন্য জমি কেনা-বেচা কঠিন হয়ে পড়েছে।

পৌরসভা ৯নং ওয়ার্ডের আবুল বাসার বলেন, হাতিয়া পৌরসভা গঠনের ২০ বছর অতিবাহিত হলেও এখানে কোন উন্নয়ন দেখা যায়নি। অতিরিক্ত কর আদায়ের কারণে সাধারণ মানুষ নাজেহাল। রাস্তা-ঘাট কিংবা অবকাঠামো উন্নয়নে কোনও পরিবর্তন আসেনি। মানুষ প্রতিটি ক্ষেত্রে বহুগুণ ট্যাক্স দিতে বাধ্য হচ্ছে। নাগরিক সেবা পেতে পদে পদে হয়রানির শিকার হচ্ছে। এবং তিনি নিজেও একজন ভুক্তভোগী বলে জানান।

হাতিয়া উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার নুরুল ইসলাম বলেন, সরকার যখন যে আইন করে তখন সে আইন বাস্তবায়ন করতে তারা বাধ্য।

এদিকে, স্থানীয় ‘সচেতন নাগরিক সমাজ-হাতিয়া’ নামক সামাজিক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মহিব্বুল মাওলা উৎসে কর সামঞ্জস্য ও সংগতিপূর্ণ করতে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেন। যাতে জমি বেচাবিক্রয়ে স্বাভাবিক গতি ফিরে আসে এবং পৌর এলাকায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি সঞ্চার হয়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আয়কর বিভাগের প্রথম সচিব(কর পরিবীক্ষণ ও প্রশিক্ষণ) মো. মোসাদ্দেক হুসেন মোবাইল ফোনে জানান, মাঠ পর্যায়ে মানুষের সমস্যার বিষয়টি অফিশিয়ালি এলে রাজস্ব বোর্ড তা পর্যালোচনা করে দেখবে।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো নিউজ