শিক্ষা কর্মকর্তার দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগ’

নিউজ ডেস্ক
আপডেটঃ : রবিবার, ২৯ জুন, ২০২৫

 

প্রতিনিধি>
নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায় শিক্ষা কর্মকর্তার অবহেলার কারণে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ফেরত যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যালয়গুলোর সংস্কারের জন্য যে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছিল, তা যথাযথভাবে কাজে লাগানো যায়নি। এতে বিদ্যালয়ে পাঠদানের সুষ্ঠু পরিবেশ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

সুবর্ণচর উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় সুবর্ণচরের ৫৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো মেরামত-সংস্কারের জন্য ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর গত ২০ এপ্রিল এক কোটি ৫৩ লাখ টাকা বরাদ্দ প্রদান করে। বরাদ্দকৃত অর্থ সরকারের আর্থিক বিধি-বিধান ও অনুশাসনাবলী যথাযথভাবে অনুসরণ করে আয়ন-ব্যয়ন কর্মকর্তা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারকে উত্তোলন ও ব্যয়ের ক্ষমতা প্রদান করা হয়।

সরেজমিনে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলার বেশ কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘুরে দেখা গেছে, বিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন পানি জমে থাকায় বিদ্যালয়ের ফ্লোরের আস্তর, চেয়ার-টেবিল ও ব্যঞ্চ নষ্ট হয়ে গেছে। ভবনের ওয়াল ও পিলারগুলোতে ফাটল ধরেছে। বিদ্যালয়ের মাঠ ও চলার পথের মাটি সরে গেছে। ওয়াশ ব্লকগুলো ব্যবহার অনুপোযোগী হয়ে গেছে। আবার বন্যার সময় আশ্রয়ন হিসেবে ব্যবহার হওয়া বিদ্যায়লগুলোর লাইট, ফ্যানসহ বিভিন্ন জিনিসপত্রও বিনষ্ট হয়েছে।

অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা বলেন, বন্যা শেষ হয়েছে প্রায় ১০ মাস হয়ে গেছে। এখনো বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যালয়গুলো মেরামত কিংবা সংস্কার করা হয়নি। এতে বিদ্যালয়ে পাঠগ্রহনের পরিবেশ ফিরে আসেনি। কোথাও কোথাও চরম ঝুকির মধ্যে ক্লাস করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। তাই ওইসব বিদ্যালয়গুলোতে নিজ সন্তানদের পাঠাতে আতঙ্কগ্রস্ত হচ্ছেন অভিভাবকরা।

সুবর্ণচরে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বেশ কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক অভিযোগ করে বলেন, গেল বছরের ভয়াবহ বন্যায় আমাদের বিদ্যালয়গুলোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরে সুবর্ণচরের ৫৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মেরামত-সংস্কারের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর গত ২০ এপ্রিল এক কোটি ৫৩ লাখ টাকা বরাদ্দ প্রদান করে। বরাদ্দকৃত অর্থে যথাযথভাবে আমাদের বিদ্যালয়গুলো মেরামত-সংস্কার করার স্বপ্নে বিভোর হয় আমরা। কিন্ত বরাদ্দ বাস্তবায়নে দুই মাসের বেশি সময় পেলেও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার সময় ক্ষেপন করায় উপজেলা প্রকৌশলী বরাদ্দ বাস্তবায়নের জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেননি। এতে ৫৪টি বিদ্যালয়ের বরাদ্দ ফেরত চলে যায় বলে জানা গেছে।

এদিকে বিদ্যালয়ের বরাদ্দ ফেরত যাওয়ার প্রতিবাদে জব্বারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসী মানববন্ধন ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। বিদ্যালয়গুলো সংস্কার করে শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে পুনরায় এই বরাদ্দ প্রদান ও বাস্তবানের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

 

সুবর্ণচর উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জব্বারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা এনায়েত উল্যাহ বাবুল এবং স্থানীয় ইউপি সদস্য মহি উদ্দিন বলেন, গত বন্যার সময় এই বিদ্যালয়ে পানি ডুকে যাওয়ার পর বিদ্যালয়টি অবকাঠামোগতভাবে পাঠদানের অনুপোযোগী হয়ে পড়ে। এতে বিদ্যালয়ের ভবনটিকে সম্পূন্ন পরিত্যাক্ত ঘোষণা করা হয়। বন্যা পরবর্তী আমাদের অনেক আবেদন-নিবেদনের পর সরকার সুবর্ণচরের ৫৪টি বিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ প্রদান করে। ওই বরাদ্দের মধ্যে সবচে বেশি বরাদ্দ এই বিদ্যালয়ের জন্য দেওয়া হয়েছে। আমাদের বিদ্যালয়ের কাজগুলো দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য গত মাস থেকে আমরা উপজেলা শিক্ষা অফিসারের কাছে একাধিকবার গিয়েছি। উনি কাজগুলো করতে গড়িমসি করেছেন। পরে শুনেছি পুরো উপজেলার ৫৪টি বিদ্যালয়ের বরাদ্দ ফেরত গিয়েছে। আমরা বলবো শুধু মাত্র উপজেলা শিক্ষা অফিসারের দায়িত্ব অবহেলার কারণেই এই বরাদ্দগুলো ফেরত গিয়েছে। এতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে।

সুবর্ণচর উপজেলা প্রকৌশলী মো. হাফিজুল হক বলেন, বন্যা পরবর্তী আমরা সুবর্ণচর উপজেলার ৫৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয় মেরামতের জন্য প্রাক্কলন তৈরী করে গত ডিস্মেবর মাসে আমাদের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে প্রেরণ করি। পরবর্তীতে আমরা আমাদের অধিদপ্তর থেকে কোন বরাদ্দ পায়নি। পরে গত ১৭ মে উপজেলা শিক্ষা অফিসার আমাদেরকে অবহিত করেন ৫৪টি বিদ্যালয়ের জন্য তাদের বরাদ্দ এসেছে। তখনি দেখা যায় আমাদের পাঠানো পূর্বের প্রাক্কলনের সঙ্গে বরাদ্দকৃত প্রাক্কলনের মিল নেই। তাই আমরা নতুন করে প্রাক্কলন তৈরী করে গত ২২ মে শিক্ষা অফিসারকে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চিঠি দিই। পরবর্তীতে এই ব্যাপারে আমরা তাঁর কাছ থেকে লিখিত কোন কিছু পাইনি। যার কারণে এ নিয়ে আর কাজ করা সম্ভব হয়নি।

সুবর্ণচর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. শাহ আলম দায়িত্ব অবহেলার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, বরাদ্দটি আসার পর আমরা শিক্ষা কমিটি গঠন করে ৭ মে কমিটির মিটিং ডেকে উপজেলা ইঞ্জিনিয়ারসহ নীতিমালা মোতাবেক যেভাবে কাজ করার কথা, সেভাবে সিদ্ধান্ত নিই। রেজুলেশন ও মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত মতে ৫৪টি বিদ্যালয় থেকে নেওয়া চাহিদাপত্র উপজেলা ইঞ্জিনিয়ারকে প্রাক্কলনের জন্য দেওয়া হয়। পরবর্তীতে উপজেলা ইঞ্জিনিয়ারের দপ্তর থেকে প্রাক্কলন তৈরী করে উনাদের কর্তৃপক্ষের আদেশ নাই মর্মে আমাদের কাছে ফেরত দিয়েছেন। বিধিমালা যাকে দিয়েছে, সেই তো কাজটা করতে হবে। যেটা আমার এখতিয়ারের মধ্যে নেই, সেটা আমি কিভাবে করবো।

সুবর্ণচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাবেয়া আসফার সায়মা বলেন, আমাদের উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও উপজেলা প্রকৌশলীর মধ্যে কোন সমন্বয়হীনতা কিংবা দায়িত্ব অবহেলার বিষয় নাই। ৫৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বরাদ্দ বাস্তবায়নে টেন্ডার প্রক্রিয়ার যে সময় প্রয়োজন, সেই সময় জুন ক্লোজিংয়ের মধ্যে না থাকায় বরাদ্দগুলো ফেরত পাঠানো হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কারও জরুরি। তাই আগামী অর্থ বছরে পুনরায় বরাদ্দগুলো পেতে আমরা চিঠি দিব।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো নিউজ