৫৩ বছরেও উল্লেখযোগ্য সংস্কার হয়নি নোয়াখালী জেলা কারাগারের 

নিউজ ডেস্ক
আপডেটঃ : বুধবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

নয়া সকাল প্রতিবেদক 

ঝুঁকি নিয়ে থাকছেন কারাবন্দি ও দায়িত্বরত কারারক্ষীরা।সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবে যায় নোয়াখালী জেলা কারাগার। চারদিকে জমা হয় থই থই পানি। ধারন ক্ষমতার প্রায় ডাবল বন্দী রয়েছে নোয়াখালী জেলা কারাগারে । উপকূলীয় অঞ্চলের নোয়াখালী জেলা কারাগারটি ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও বিগত ৫৩ বছরে উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কার বা আধুনিকায়নের মুখ দেখেনি। ফলে বর্ষা মৌসুম এলেই এই সরকারি প্রতিষ্ঠানটি পরিণত হয় এক ভয়ংকর মরণফাঁদে।

কারা সূত্রে জানা যায়, পুরাতন অবকাঠামো ও সড়ক সংস্কারের অভাবে সামান্য বৃষ্টি হলেই ডুবে যায় প্রধান প্রবেশপথ। এ ছাড়া নিচু ভূমি ও দীর্ঘদিন ধরে ড্রেনেজ ব্যবস্থা বিকল হয়ে পড়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই কারাগারের ভেতরে পানি ঢুকে পড়ে। এতে বন্দিদের কারারক্ষীদের চলাচলে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। এর মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে থাকছেন কারাবন্দি ও দায়িত্বরত কারারক্ষীরা।

এ ছাড়া কারাগারের চারিদিকে নিচু পেরিমিটার ওয়াল ও বাউন্ডারি ওয়াল না থাকায় কারাবন্দিদের পালিয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
জানা যায়, নোয়াখালী জেলা কারাগার সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৭ সালে মাইজদি কোর্ট এলাকায়। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে কারাগারটি পুলিশ লাইন্সের পেছনে বর্তমান স্থানে স্থানান্তর করা হয়। কারাগারের মোট জমির পরিমাণ ৩৬ একর। এর মধ্যে পেরিমিটার ওয়ালের ভেতরে রয়েছে ৮.৫০ একর এবং বাইরে রয়েছে ২৭.৫০ একর জমি। ৫৩ বছরে রাস্তাঘাটসহ কিছু অবকাঠামো নির্মাণ করা হলেও কারাগারের ভেতর ও বাইরের অনেকগুলো ভবনে কোনো সংস্কার করা হয়নি। অত্যাধিক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে বন্দিদের কয়েকটি ভবন। এ ছাড়া বেহাল অবস্থা তৈরি হয়েছে কারাগারের কয়েকটি ওয়ার্ডেও।

৩সেপ্টম্বর সরেজমিনে দেখা যায়, নোয়াখালী জেলা কারাগারের ৮২৩ জন বন্দী রয়েছে, মৃত্যু দন্ডপ্রাপ্ত ১জন মহিলাসহ ৬ জন অবস্থান করছেন, এছাড়াও মহিলা ৩জনসহ ৫৭ বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রাপ্ত এবং সশ্রম কারাদণ্ড প্রাপ্ত মহিলা ১জনসহ ৯৭জন কয়েদী কারাগারে রয়েছে। বন্দিদের দুপুরের খাবার দেখে মান সম্পুর্ন হয়েছে।

কারাগারের ভেতর ও বাইরে কারাবন্দি ও কারারক্ষীদের জন্য নির্মিত অনেক ভবনে ফাটল ধরেছে, বেরিয়ে পড়েছে রড, খসে পড়েছে পলেস্তারা। যে কোনো সময় ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। ঝুঁকিপূর্ণ হলেও এসব ভবনে এখনও বসবাস করছেন তারা। স্বজনদের সঙ্গে বন্দিদের সাক্ষাতের ঘরটিও জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
স্থানীয় নাগরিক সমাজের নেতারা বলছেন, নোয়াখালীর এত বুদ্ধিজীবি, রাজনীতিবীদ সরকারের সচিব, ও উচ্চপদস্থ লোক থাকলেও একটি জেলা কারাগার এমন জীর্ণ দশায় থাকবে—এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তারা কারাগারকে আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন ভবনে রূপান্তরের জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে হয়। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, শুধু প্রস্তাব নয়, জরুরি ভিত্তিতে দৃশ্যমান সংস্কার প্রয়োজন।
জেলা শহরের বাসিন্দা ও সাংবাদিক ও

মানবাধিকার কর্মী ইমাম উদ্দিন বলেন, আমাদের নোয়াখালী জেলা কারাগারটি বর্তমানে অত্যন্ত জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বন্দিদের স্বজনদের সাক্ষাতের স্থানে তার ছেড়া ও ভাঙাচোরা অবস্থা স্পষ্ট। সামান্য বৃষ্টিতেই কারাগারের প্রধান সড়কটি পানিতে ডুবে যায়, সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। কখনও কখনও ওই পানিতে হাঁস ভাসতে দেখা যায়। এতে বন্দিদের স্বজনরা কারাগারে প্রবেশ করতে পারেন না। ফলে তাদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। প্রায় ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল। খসে পড়ার মতো অবস্থায় রয়েছে ছাদের পলেস্তারা। ভবনগুলো দ্রুত সংস্কারের প্রয়োজন।
নোয়াখালী জেলা কারাগারের জেলার মোহাম্মদ ফরিদুর রহমান রুবেল বলেন, নানান সমস্যায় জর্জরিত নোয়াখালী কারাগার। আমরা গণপূর্ত বিভাগকে চিঠি দিচ্ছি কোনো সাড়া পাচ্ছি না। বৃষ্টি হলেই কারাগারের সবার ভোগান্তি বেড়ে যায়।

এমন পরিস্থিতিতে বৃষ্টি হলে খাদ্য সরবরাহ, চিকিৎসা, চলাচলসহ সব কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে। কয়েদিদের পাশাপাশি কারারক্ষীরাও ঝুঁকির মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন।

জেল সুপার আ. বারেক বলেন, জেলা কারাগারটি ৫৩ বছরেরও অধিক সময় আগে নির্মিত হয়েছে। কারাগারের যেসব ভবন ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে তার মধ্যে কোথাও সংস্কার, আবারা কোথাও ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করা প্রয়োজন। নির্মাণ ত্রুটির কারণে কারাগারের ভেতরটা নিচু। ফলে বৃষ্টি হলেই পানি ভেতরে জমে যায়। বন্দিদের ভবনগুলোর ফ্লোর ডুবে যায়। কারাগার পুনর্নির্মাণের জন্য ৩৫০ কোটি টাকার প্রকল্প জমা আছে। সরকার যদি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখে তাহলে সবার জন্য ভালো হয়।

গণপূর্ত বিভাগ নোয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কামরুল হাছান
বলেন, নোয়াখালী জেলা কারাগারের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আমরা অবগত। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আমাদের এ বিষয়ে চিঠি দিয়ে অবহিত করেছে। তবে শুধু চিঠি দিলেই হবে না—আমাদের বরাদ্দ সীমিত। সেই সীমিত বাজেট থেকেই অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বিভিন্ন খাতে বণ্টন করতে হয়। তারপরও আমরা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি, যাতে নতুন ভবন নির্মাণসহ কারাগারের সব সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হয়।

তিনি আরও বলেন, কারাগার পুনর্নির্মাণ ও আধুনিকায়নের জন্য ৩৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। এই প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে কারাগারের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর দ্রুতই সমাধান হবে বলে আমরা আশাবাদী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো নিউজ