ছায়েদ আহামেদ, হাতিয়া (নোয়াখালী)।
হাতিয়ায় লিড ফার্মারদের প্রাপ্য টাকাসহ বিভিন্ন প্রকল্পের প্রায় ২০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল বাছেদ সবুজ ও তার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আলতাফ হোসেনের বিরুদ্ধে। এসএসিপি ও সিএফসি প্রকল্পসহ বিভিন্ন সরকারি প্রণোদনা থেকে বরাদ্দ পাওয়া টাকাগুলো তারা দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে আত্মসাৎ করেছে বলে অভিযোগ করেন ক্ষুব্ধ কৃষকরা। পরে অভিযোগকারী কৃষকদের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার চালানোরও অভিযোগ উঠেছে।
হাতিয়ার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার মধ্যে সাতটি ইউনিয়নে তিনজন করে মোট ২১জন লিড ফার্মার নিয়োগ দিয়েছে কৃষি অফিস। ২০২১ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তাদেরকে বাৎসরিক বিভিন্ন অঙ্কে ভাতা দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সাল থেকে মাসে ছয় হাজার করে জন প্রতি বাৎসরিক ৭২ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। সেক্ষেত্রে কাওকে এক বছরে ৩৬ হাজার টাকা কাওকে ১৮ হাজার টাকা করে দিয়েছে। আর সেবিকা রাণী দাস নামের এক নারীসহ কয়েকজন লিড ফার্মারকে কোনো টাকাই দেওয়া হয়নি। অবশিষ্ট সব টাকা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা যোগসাজশে আত্মসাৎ করেছেন বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন।
এসএসিপি ও সিএফসি প্রকল্প থেকে কোটি টাকা সরকারি বরাদ্দ এলেও তার সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না। বরং স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে অধিকাংশ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে কৃষকরা অভিযোগ করেন।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ফার্মার্স টু ফার্মার্স এক্সচেঞ্জ ভিজিট-২০২৫ প্রোগ্রামে কর্মকর্তারা প্রোগ্রাম কম সময়ের মধ্যে শেষ করে প্রাপ্ত অর্থ তসরুপ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সূচনায় ২ দিনব্যাপী এ প্রোগ্রামে মোট ৫০ জন কৃষকের অংশগ্রহণ হওয়ার কথা থাকলেও, একদিনে ৪২ জন কৃষক নিয়ে প্রোগ্রাম শেষ করে দুই দিনের অর্থ দখল করা হয়েছে।
চরকিং ইউনিয়নের লিড ফার্মার শাহাদাত হোসেন ইব্রাহিম জানান, ২০২৪ সালে তিনি ৩৬ হাজার টাকা পেয়েছেন, বাকি টাকা বিকাশে দেয়ার কথা থাকলেও তা পাননি। একই এলাকার ফরহাদ, এরশাদসহ অন্যরা একই দুর্ভোগে রয়েছেন। তারা অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের শাস্তির দাবি জানিয়ে ৬ সেপ্টেম্বর সাংবাদিক সম্মেলন করেছেন। কিন্তু ওই কর্মকর্তারা উল্টো তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার শুরু করেছেন।
চরইশ্বর ইউনিয়নের ফরহাদ অভিযোগ করেন, মাত্র ১৮ হাজার টাকা পেয়েছেন এবং দায়িত্ব থেকেও বাদ দেওয়া হয়েছে। একই এলাকার সেবিকা রাণী দাস নামে এক নারী লিড ফার্মার গত বছর এক টাকাও পাননি এবং দায়িত্ব থেকেও বাদ পড়েছেন।
এছাড়া, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরো তিন ভুক্তভোগী লিড ফার্মার জানান, এ দুই কর্মকর্তা এসএসিপি ও সিএফসি প্রকল্প থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। তারা যখন যাকে খুশি তাকে বাদ দেন আবার যাকে খুশি লিড ফার্মারে নিযুক্ত করেন। কৃষক ট্রেইনিংয়ের টাকাগুলোও তারা নানান কৌশলে আত্মসাৎ করেন।
এদিকে, তমরোদ্দি ইউনিয়নের কৃষি উপসহকারি আলতাফ হোসেন গত সাত মাস ধরে মাঠে না থেকে অফিসে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ইউরিয়া সার আগমনী বার্তাসহ গোপনীয় ফাইল সংরক্ষণ এবং সরকারের বরাদ্দকৃত কৃষি প্রণোদনা ও প্রল্প- বন্টন তালিকা তিনিই করেন বলে জানা যায়। পার্টনার প্রকল্প থেকে বরাদ্দকৃত গাড়িটি আলতাফ হোসেন প্রায় নিজ কাজে ব্যবহার করেন বলে স্থানীয়রা জানান।
চলতি বছরের ১৭ জুলাই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো.ছাইফুল আলম স্বাক্ষরিত এক আদেশে অধিনস্ত দপ্তর সমূহ থেকে সকল সংযুক্তি বাতিল করলেও আলতাফ হোসেন নিজ ক্ষমতা বলে অফিস ডিউটি করে থাকেন। অর্থাৎ দুই দিকের সুবিধা তিনি একাই ভোগ করেন।
তমরোদ্দি ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ড বটতলী এলাকার ২৬ বছর বয়সী মো.হৃদয়, দাসের হাট এলাকার আনোয়ার হোসেন এবং জোড়খালী এলাকার কৃষক সাহাব উদ্দিন জানান, তারা প্রকৃত চাষি। কখনো কৃষি সহায়তা পায়নি। কয়েকবার আইডি কার্ড নিয়ে কিচ্ছু দেয়নি। যারা চাষ করেনা এবং যাদের সাথে আলতাফ হোসেনের সম্পর্ক আছে তাদেরকে কৃষি উপকরণ দেওয়া হয়।
তারা আরো জানান, আলতাফ হোসেন নিজ এলাকার পার্শ্ববর্তী তমরোদ্দিতে দীর্ঘদিন দায়িত্বে থাকায় ব্যাপক অনিয়ম করেছেন। গত ছয় মাসে তাকে মাঠে দেখা যায়নি। কোনো কাজে ফোন করলে তিনি অফিসে যেতে বলেন। মাঝে মধ্যে তাকে বেঁকের বাজার আড্ডা দিতে দেখা যায়। আর সবসময় তিনি অফিসে থাকেন।
অভিযোগ সম্পর্কে আলতাফ হোসেন বলেন, অফিসে তিনি রিপোর্ট জমা দিতে গেছেন। ফার্মার্স টু ফার্মার্স এক্সচেঞ্জ ভিজিটে তিনি সহায়তাকারী হিসেবে গেছেন।
হাতিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল বাসেদ সবুজ বলেন, লিড ফার্মারদের বিরুদ্ধে প্রচারণা তিনি করাননি। আলতাফ হোসেনসহ অন্যান্যরা করেছে। অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার জন্য উপসহকারী আলতাফ হোসেনকে রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে নোয়াখালী জেলা কৃষি উপপরিচালক আশীষ কুমার কর জানান, তিনি নতুন জয়েন্ট করেছেন। মাঠ ভিজিটে এসে এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখবে।