নোয়াখালী বিএডিসিতে সরকারি অর্থ আত্মসাৎসহ ব্যাপক অনিয়ম

নিউজ ডেস্ক
আপডেটঃ : রবিবার, ২৯ জুন, ২০২৫

  • নোয়াখালী

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) নোয়াখালীর উপ-পরিচালক (বীজ বিপণন ও এএসসি) নুরুল আলমের বিরুদ্ধে মৃতব্যক্তি, প্রবাসী ও অনিয়মিত শ্রমিকদের নামের ভুয়া ব্যাংক হিসাব খুলে সরকারি টাকা হরিলুট,আত্মসাৎসহ ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধান বলছে, নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষ্মীপুর তিন সমন্বিত জেলার বীজ বিপণন কর্মকর্তা পদে থেকে নোয়াখালী বিএডিসির উপ-পরিচালক নুরুল আলম নামে-বেনামে অনিয়মিত শ্রমিকের নাম করে বছরের পর বছর হাতিয়ে নিচ্ছেন কোটি কোটি টাকা। আবার তাকে ঘুষ না দিলে বরাদ্দকৃত বীজ পাচ্ছেন না চুক্তিবদ্ধ ডিলাররা। অফিসের কেউ তার এসব অপকর্মের বিষয়ে কথা বললে বদলি বা রোষানলের শিকার হতে হয়। দারোয়ান, ঝাড়ুদার, চাষী, অনিয়মিত শ্রমিক, কৃষি সার্ভিস সেন্টার কর্মচারীর নামে-বেনামে অনিয়মিত শ্রমিক সাজিয়ে সরকারি অর্থ জালিয়াতির ব্যাপক তথ্য প্রমাণ ও নথি পাওয়া গেছে এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এছাড়া সরকারি কাগজে কলমে প্রশিক্ষণ ভাতা উত্তোলন করলেও প্রশিক্ষণের তালিকায় থাকা অনেকেই প্রশিক্ষণের বিষয়টি জানেই না। এমন অদ্ভুত সব অর্থ জালিয়াতি চলছে বিএডিসি (বীজ বিপণন) নোয়াখালী কার্যালয়ে।

সরেজমিনে অনুসন্ধান ও নথিপত্র থেকে জানা যায়, চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার চকরা গ্রামের তুলু পুকুরিয়া বাড়ীর আব্দুল মুনাফের ছেলে আবুল কাশেম মনির হোসেন গত আট বছর ধরে বিএডিসির নোয়াখালী জেলা কার্যালয়ে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। শারীরিক বিভিন্ন অসুস্থতার কারণে ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন মনির। সেদিন বিকেলেই মনির হোসেনকে নিজ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হলেও বিএডিসির কাগজে-কলমে এখনো জীবিত থেকে ভাতা নিয়েছেন মনির হোসেন। তার মৃত্যু সনদ অনুযায়ী এপ্রিল মাসের ২০ দিন তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসারত থাকলেও বিএডিসি কার্যালয়ের বীজ বিপণন শাখার তথ্য বলছে তিনি সেখানে ২২ দিন উপস্থিত ছিলেন। নিয়েছেন ভাতা, যদিও এর কিছুই পায়নি বলে দাবি মৃত মনির হোসেনের পরিবারের।

বিএডিসির বীজ বিপণন শাখার তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের মে মাসের হাজিরা খাতায় আবুল কাশেম নামে স্বাক্ষর করে ভাতা নিয়েছেন মনির হোসেন। জুন মাসে একই শাখা থেকে ঈদুল আযহার বোনাস হিসেবে ৭৫০০ টাকা মনির হোসেন নামের ব্যাংক হিসাবে প্রবেশ করেছে। এদিকে এই মনির হোসেন ও আবুল কাশেম একই ব্যক্তির দুই নামে অর্থ আত্মসাৎ করলেও তার পরিবারের কেউ তা জানেই না।

বিএডিসিতে আরেক চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন সাইফুল ইসলাম। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত চার মাসই তিনি একই সময়ে কাজ করেছেন বিএডিসির এগ্রো সার্ভিস সেন্টার এবং বিপণন শাখায়। প্রতি মাসেই এগ্রো সার্ভিস সেন্টার থেকে ২৯ দিন এবং বীজ বিপণন থেকে ২২ দিনের ভাতা তুলেছেন। তিনি আবার বিএডিসি ছেড়ে চুক্তিভিত্তিক চাষী হিসেবেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পেয়েছেন ৪ লাখ ৭ হাজার টাকা। একই ব্যক্তি একই দিনে দুটি পৃথক প্রতিষ্ঠানে কিভাবে কাজ করেছেন তাও আবার পুরো মাসজুড়ে তার কোন সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি। আবার, সাইফুল ইসলামের ছোট ভাই শামসুল ইসলাম ২০২৪ সালের মার্চ মাসে প্রবাসে পাড়ি দিলেও সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত বিএডিসির এগ্রো সার্ভিস সেন্টার থেকে অনিয়মিত শ্রমিক হিসেবে তার ব্যাংক হিসাবে টাকা ঢুকেছে।

বিএডিসির বীজ বিপণন শাখার অনিয়মিত শ্রমিকদের হাজিরা খাতা বলছে, ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসের ৭ তারিখে সর্বশেষ এখানে কাজ করেছেন মুক্তা আক্তার। যদিও এখন পর্যন্ত প্রতি মাসেই হাজিরা না থাকা সত্ত্বেও ভাতা পাচ্ছেন মুক্তা আক্তার। অথচ এই মুক্তা আক্তারই মনির হোসেনের স্ত্রী যিনি কখনোই নোয়াখালী আসেননি। চাঁদপুরে বসবাস করেও বিএডিসি নোয়াখালী অফিসে প্রতিদিন কাজ করে অনিয়মিত শ্রমিকের ভাতা নিচ্ছেন মুক্তা আক্তার যার পুরোটাই আত্মসাৎ করছেন উপ-পরিচালক নুরুল আলম।

মনির হোসেন, সাইফুল ইসলাম ও শামসুল ইসলামের মত আরও ১৫-২০ জন গত পাঁচ বছর সময় যাবত একই সময়ে বিএডিসির এগ্রো সার্ভিস সেন্টার ও বীজ বিপণন থেকে মাসিক মজুরি পাচ্ছেন। চাকুরী না করেও অনেকেই পাচ্ছেন বোনাসও। রহমত উল্যাহ রাজু নামে এক অটো চালক অনিয়মিত শ্রমিক হিসেবে বেতন নিচ্ছেন অথচ যার কোন অস্তিত্বই নেই বিএডিসি অফিসে।

বিএডিসির এগ্রো সার্ভিস সেন্টারে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অনিয়মিত শ্রমিকদের হাজিরা ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাগজ এএসসির কর্মকর্তা ও হিসাবরক্ষণ শাখার কাছে থাকার কথা থাকলেও তা বীজ বিপণন এর উপ-পরিচালক নিজের রুমে তালাবদ্ধ রেখে হিসাব পরিচালনা করেন।

এদিকে গত ১৬ ও ২৩ নভেম্বর ২০২৩ তারিখে নোয়াখালীতে কৃত্রিম সংকট তৈরী করে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই ভুয়া চালানের মাধ্যমে ধান ও বীজ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই সিলেট ও সুনামগঞ্জে বিক্রির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া সহকারী হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার স্বাক্ষর জালিয়াতি করে বিল উত্তোলন করেন এই কর্মকর্তা যার প্রমাণ মিলেছে অনুসন্ধানে।

উপ-পরিচালক (বীজ বিপণন ও এএসসি) নুরুল আলমের আপন ভাই সাইফুল আলম, যিনি বিএডিসির ফার্নিচার ও আসবাবপত্র সরবরাহের ঠিকাদার ছিলেন।যার প্রমাণ ২০২৩ সালের মার্চ মাসের ২১ তারিখের একটি কার্যাদেশের মাধ্যমে পাওয়া যায়। দরপত্র গোপন করে নিজ ভাইকে তিনি কীভাবে তারই অফিসে ঠিকাদারী কাজ দিয়েছেন তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দরপত্রে থাকা মামালাম সরবরাহ নিয়ে কোন সদুত্তর দিতে পারেননি ঠিকাদার পরিচয় দেয়া নুরুল আলমের ভাই সাইফুল আলম।

নুরুল আলমের এসব অনিয়মের ও অর্থ জালিয়াতির বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকেই তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছে, অত্র অফিসে যোগদানের পর তিনি পুরোপুরি স্বেচ্ছাচারিতার সাথে বিভিন্ন অপর্কম করে জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করছেন। এছাড়া বহিরাগত কিছু সন্ত্রাসীর সাথে তার যোগসাজশ থাকার কারণে অনেকটা অসহায়ের মত তার সকল অপকর্ম সহ্য করতে হয় বিএডিসি (বীজ বিপণন) কর্মচারীদের।

দৈনিক বেতন ভোগী শ্রমিক জাহিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তাদের প্রয়োজন মাফিক শ্রমিক নিয়োগ না করে প্রতিদিন দৈনিক ৮ ঘণ্টার কাজের পরিবর্তে তাদের কখনো ১২-১৬ ঘণ্টা কাজ করিয়ে নেন বীজ বিপণন কর্মকর্ত নুরুল আলম। বাড়তি কাজের জন্য টাকা উত্তোলন করলেও অধিকাংশ সময় দেয়া হয়না কোন বাড়তি কাজের মজুরী।

দৈনিক হাজিরা খাতা পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, খাতায় চারজন শ্রমিক প্রতিদিন কাজে দেখালেও সেখানে কাজ করছিলেন জাহিদ ও বেলাল নামে মাত্র দুজন শ্রমিক। নো ওয়ার্ক নো পে অনুযায়ী তাদের বেতন হলেও হাজিরা খাতায় ব্যাপক গরমিল পাওয়া গেছে। হাজিরা খাতায় গরমিল ঘষামাঝা, নিয়ে জিজ্ঞাসা করলে সাংবাদিকের সামনেই তিনি জাহিদ ও বেলালকে ডেকে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করিয়ে নেয়ার জঘন্যতম কাজটিও করেন।

অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে নুরুল আলম এই সংবাদদাতাকে নগদ অর্থ ও অনিয়মিত চাষী দেখিয়ে প্রতি মাসে ঘুষ প্রদানের অনুরোধ জানান। তার অনুরোধ প্রত্যাখান করা হলে তিনি জুন মাস পর্যন্ত বিভিন্ন নথিপত্র ঠিক করে নেয়ার অনুরোধ জানান। এ সাংবাদিককে ঘুষ প্রদানে ব্যর্থ হয়ে তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করলে মানহানি মামলার হুমকিও দেন তিনি । এছাড়া তিনি বলেন, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আমার ভালো সম্পর্ক। মহাব্যবস্থাপক স্যার নিজেই আমাকে এখানে পাঠিয়েছেন। স্যার আমার সব জানেন। স্যার আপনার কথার কোন পাত্তা দেবেনা। সবাইকে ম্যানেজ করা আছে। দুদক বা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কেউই আমার কিছুই করতে পারবে না।

বিএডিসি (বীজ বিপণন) মো: নুুরুল আলমের এসব নানা অনিয়মের বিষয় জানতে চাইলে বিএডিসির এগ্রো সার্ভিস সেন্টারের মহাব্যবস্থাপক ড. মোঃ ইসবাত বলেন, অনেকে উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে সরকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি করে। যদি নোয়াখালীর উপ-পরিচালক নুরুল আলম এই ধরণের কোন অনিয়ম করে থাকে, তবে তদন্তে সত্য প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো নিউজ