নয়া সকাল প্রতিবেদকঃ
নোয়াখালী সদর উপজেলার আলীপুর গ্রামের বাসিন্দা ওসমান গনি। শহরের মাইজদী এলাকায় ব্যবসা করেন তিনি। তাঁকে বাড়ি ফিরতে দিতে হয় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ বিনোদপুর-আলীপুর সড়ক ধরে। ওই সড়কটিতে এখন বড় বড় গর্ত। ফলে কিছুদিন আগের বর্ষণে পানি জমে যায়। সম্প্রতি তাঁর বাবা মোহাম্মদ সেলিম (৬৫) রিকশায় করে বাড়ি ফিরছিলেন। ওই সড়কের গর্তে চাকা পড়ে উল্টে যায় রিকশা। এতে দুই হাঁটুতে আঘাত পান মোহাম্মদ সেলিম। এখনও তিনি স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারছেন না।
জেলার বেশির ভাগ সড়কেই এমন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন ৩০ লক্ষাধিক মানুষ। চাটখিল, সোনাইমুড়ী, বেগমগঞ্জ, সেনবাগ, কোম্পানীগঞ্জ, কবিরহাট, সদর ও সুবর্ণচর ও হাতিয়া উপজেলায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীনে সড়ক আছে ৯ হাজার ৭৯ কিলোমিটার। এর মধ্যে পাকা সড়ক তিন হাজার ৫০৯ কিলোমিটার, ইটের সলিং দেওয়া সড়ক ২০৯ কিলোমিটার ও মাটির রাস্তা পাঁচ হাজার ৩১০ কিলোমিটার। অধিকাংশ সড়কই এখন বেহাল। খানাখন্দে ভরা এসব সড়ক দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে নাজেহাল সাধারণ মানুষ।এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী, নোয়াখালী কার্যালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এসব সড়ক মেরামতের জন্য প্রতি বছর প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ চেয়ে চাহিদাপত্র পাঠাচ্ছেন তারা। কিন্তু বরাদ্দ মিলছে চাহিদার এক-তৃতীয়াংশেরও কম। ফলে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক মেরামত করা যাচ্ছে না।
ওই কার্যালয় সূত্র জানায়, গত বছরের আগস্টে শুরু হওয়া দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় জেলার হাতিয়া উপজেলা ছাড়া বাকি আটটি উপজেলার রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এসব সড়ক দিয়ে এখন যানবাহন চলাচল তো দূরের কথা, হেঁটে চলাচল করতেও বেগ পেতে হয়।
গত আগস্টে এই প্রতিবেদক চাটখিল উপজেলার কচুয়া-সাহাপুর-বটতলী সড়ক, চাটখিল-মনোহরপুর-পাল্লাবাজার সড়ক, খিলপাড়া-দেলিয়াই সড়ক, দশঘরিয়া-সাহাপুর সড়ক, খিলপাড়া-আবিরপাড়া সড়ক, কাচারী বাজার-বারইপাড়া সড়ক; বেগমগঞ্জ উপজেলার বাংলাবাজার-পদিপাড়া সড়ক, আমিশাপাড়া-পদিপাড়া সড়ক, রাজগঞ্জ-বাংলাবাজার সড়ক, জয়কৃষ্ণপুর সড়ক; সদর উপজেলার বিনোদপুর-আলীপুর সড়ক, বাহাদুরপুর-গোপীনাথপুর সড়ক, কৃষ্ণরামপুর-বোর্ড অফিস সড়ক; সেনবাগ উপজেলার ছাতারপাইয়া ইউনিয়নের ছাতারপাইয়া-ডুমুরিয়া সড়ক ঘুরে দেখেন। সবক’টি সড়কের পিচ-ঢালাই উঠে গেছে। মাঝখানে বড় বড় গর্ত দেখা যায়। সড়কগুলোর মাঝখানে ও দু’পাশের বিভিন্ন অংশে পাথর ও ইটের খোয়া বেরিয়ে গেছে।এসব গর্তে প্রায়ই দুর্ঘটনায় পড়ছে যানবাহন। নষ্ট হচ্ছে যন্ত্রাংশ।
সদর উপজেলার কাদির হানিফ ইউনিয়নের ইসলামিয়া সড়কের বাসিন্দা প্রান্ত চন্দ্র সূত্রধর, সুমাইয়া তাবাসসুম, রাত্রি ও মো. বেলাল হোসেন নোয়াখালী সিটি কলেজের শিক্ষার্থী। তাদের যাতায়াত করতে হয় কৃষ্ণরামপুর-বোর্ড অফিস সড়ক ধরে। তারা বলেন, এই সড়কটি যেন দুর্ভোগের অন্য নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন এই পথ দিয়ে চলতে গিয়ে বেগ পেতে হচ্ছে। কোনো রিকশা নিয়েও চালকরা যেতে চান না। কেউ রাজি হলেও ২০-৩০ টাকার ভাড়া ৬০-৭০ টাকা আদায় করছেন।
একই ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামের বাসিন্দা ইকবাল হোসেন সুমন (৩৮) পেশায় সংবাদকর্মী। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কৃষ্ণরামপুর-বাহাদুরপুর-বাঁধেরহাট কলেজ সড়কটি তিন কিলোমিটার দীর্ঘ। প্রতিদিন স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা ও কিন্ডারগার্টেনের শত শত শিক্ষার্থীকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এখান দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। গত ১৭ আগস্ট এই সড়কে একটি রিকশা উল্টে পড়ে। এতে আহত হন ছয় বছর বয়সী তানিম ও তার মা গৃহবধূ নারগিস আক্তার (২৫)। সড়কের কাদাপানি বাসাবাড়ি ও দোকানপাটে ঢুকে যাচ্ছে। এখান দিয়ে গেলেই বোঝা যাবে, নোয়াখালীর কী উন্নয়ন হয়েছে!
ছাতারপাইয়া-ডুমুরিয়া সড়ক দিয়ে চলাচলের সময় যানবাহন উল্টে যাওয়ার আতঙ্ক ভর করে বলে জানান অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আমির হোসেন। তিনি সেনবাগের ছাতারপাইয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা। ইউনিয়নের বাসিন্দা আতাউর রহমান ছাতারপাইয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তিনি বলেন, রাস্তা খারাপের অজুহাত দেখিয়ে সিএনজি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালকরা দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়া আদায় করেন। অনেকটা নিরুপায় হয়ে যাত্রীদের সেই ভাড়া গুনতে হচ্ছে।বেগমগঞ্জ উপজেলার একলাসপুর ইউনিয়নের জয়কৃষ্ণপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. তারেকের ভাষ্য, ওই ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বারেক মিয়া সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। কাঁচা এই সড়কটি স্বাধীনতার পর থেকে পাকা করা হয়নি। গত বছরের আগস্টে একই এলাকার মো. আবদুল হালিমের স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিন্তু রাস্তার কারণে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া যায়নি। বিনা চিকিৎসায় বাড়িতেই মারা যান তিনি।
সুবর্ণচরের পূর্ব চরবাটা ইউনিয়নের তোতার বাজার-হাবিবিয়া মার্কেট পর্যন্ত তিন কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি বেহাল দীর্ঘদিন ধরে। এ তথ্য জানিয়ে পূর্ব চরবাটার বাসিন্দা ও সংবাদকর্মী আরিফুর রহমান সমকালকে বলেন, গত ২২ জুলাই সবজিবোঝাই একটি ট্রাক ওই সড়কের পুরাতন স্লুইসগেট এলাকায় গর্তে পড়ে উল্টে যায়। এতে চালক ও সহকারী আহত হন। এ ছাড়া ওই ইউনিয়নের জোবায়ের বাজার রাস্তার মাথা থেকে মঞ্জু চেয়ারম্যানের বাজার সড়কটির সাড়ে চার কিলোমিটার অংশ বেহাল। এই সড়কজুড়ে বড় গর্তের সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। এলাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সড়ক দুটি দ্রুত সময়ের মধ্যে সংস্কার দাবি জানান তিনি।
নিজ নিজ এলাকার সড়কগুলোর করুণ দশার কথা জানিয়ে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন কয়েকজন জনপ্রতিনিধি। সম্প্রতি সমকালের সঙ্গে কথা হয় সদর উপজেলার কাদির হানিফ ইউপি চেয়ারম্যান আবদুর রহিম, সেনবাগের ছাতারপাইয়া ইউপি চেয়ারম্যান আবদুর রহমান, চাটখিলের বদলকোট ইউপি চেয়ারম্যান সোলায়মান শেখ, বেগমগঞ্জের রাজগঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান সেলিমের। তারা বলেন, এসব সড়কের অনেকগুলো এক যুগেও সংস্কারের ছোঁয়া পায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দীর্ঘদিন ধরে তারা আবেদন-নিবেদন করেছেন। কিন্তু কোনো সুফল মেলেনি।
জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ মাহফুজুল হক হোসাইনের ভাষ্য, বন্যা ও বৃষ্টির জেলার অধিকাংশ রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী।৯টি উপজেলার সব জায়গায়ই সড়কের পাশের খাল ও নালা ভরাট করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে পানি নামতে পারে না। এ কারণেই রাস্তাঘাট দ্রুত নষ্ট হচ্ছে বলে দাবি করেন।
শেখ মাহফুজুল হক হোসাইন আরও বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত ৯ হাজার ৭৯ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার ও মেরামতে তাদের প্রয়োজন প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। ওই টাকা বরাদ্দ চেয়ে গত জুলাইয়ে চিঠি দিয়েছেন। বরাদ্দ পেলেই কাঁচা সড়ক পাকা করা ও ভাঙাচোরা সড়ক সংস্কারে হাত দেবেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৮০ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এতে সরকারের ১০৯ কোটি টাকা খরচ হয়েছে।
নোয়াখালী জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খন্দকার ইসতিয়াক আহমেদ এলজিইডির অধীনে ৯টি উপজেলার এসব সড়কের অবস্থা সম্পর্কে অবগত। তিনি বলেন, আর্থিক সংকটের কারণে সড়কগুলো মেরামত করা যাচ্ছে না। তারা সভা করে প্রয়োজনীয় টাকা বরাদ্দের চাহিদাপত্র সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরে পাঠিয়েছেন। বরাদ্দ পেলেই এলজিইডি কাজ শুরু করবে।